নদীকে দখল মুক্তকরণে কঠোর অবস্থানে সরকার

মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১:৪২ অপরাহ্ণ

নদীকে দখল মুক্তকরণে কঠোর অবস্থানে সরকার

নদী-খালমুক্ত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ওই লক্ষ্যে আটঘাট বেঁধেই দেশজুড়ে একযোগে অভিযান শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর নদী ও খাল উদ্ধারে একযোগে অভিযান চালানো হচ্ছে। এখন ঢাকার বাইরের নদী, খাল রক্ষায়ও একযোগে অভিযান শুরুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ অন্যান্য নদী দখল-দূষণমুক্ত ও নাব্য ফিরিয়ে আনতে একটি মাস্টারপ্ল্যান আগেই তৈরি করা হয়েছে। আর ওই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই নদী, খাল, জলাশয় উদ্ধারে নদীভিত্তিক উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অবৈধ দখলদাররা দেশের অধিকাংশ নদীর পানির উৎসমুখ বন্ধ করে, ভরাট করে, দখল করে নদীকে মেরে ফেলছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি বা প্রবাহ না থাকায় বিলীন হওয়ার পথে দেশের এক-তৃতীয়াংশ নদী। বর্ষাকালে প্রবাহমান থাকা অর্ধেকের বেশি নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। ওসব জায়গায় সারা বছরই চলে চাষাবাদ। বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ে সেগুলোকে আর নদী বলেই মনে হয় না। ইতোমধ্যে অনেক নদী বিলুপ্ত হয়ে কালের সাক্ষী হয়ে গেছে। আবার মৃত্যুর প্রহরও গুনছে অনেক নদী। যে নদীগুলোকে কেন্দ্র করে রাজধানীর গোড়াপত্তন হয়েছিল, সেই বুড়িগঙ্গাসহ এর চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তুরাগ, বালু,

শীতলক্ষ্যা এবং ধলেশ্বরী নদী দখল দূষণেকরণ অবস্থার শিকার। সেগুলোর অস্তিত্বও হুমকির মুখে। দেশের মধ্যে থাকা নদীগুলোতে চলছে সীমাহীন দখল উৎসব। মানুষের লোভ বা মুনাফার কারণে শুধু নদীর গতিপথই বদলে যাচ্ছে না, নদীগুলোর প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর আঘাত করছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশী, বালু, লৌহজং এবং শীতলক্ষ্যা নদীর দু’ধারে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে ওসব নদীতে পড়ছে। আর বর্জ্যের বিষক্রিয়ায় ওসব নদী প্রাণহীন হয়ে পড়েছে।

সূত্র জানায়, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ হলো দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি ঐতিহাসিক দলিল। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০১৮ সালে একনেকের বৈঠকে একশ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ডেল্টা বা বদ্বীপ পরিকল্পনা পাস করা হয়েছে। তার আলোকেই প্রাথমিকভাবে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। মূলত ডেল্টা প্ল্যানের অংশ হিসেবেই নদী-খাল-জলাশয় উদ্ধারের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ছোট ছোট পার্ক নির্মাণ, বৃক্ষরোপণসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই পরিকল্পনা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও আর্থ-সামাজিক দলিল। এই পরিকল্পনার মধ্যে বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানি প্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা এবং পানি প্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলো স্থিতিশীল রাখার কথা বলা হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা রাখা, নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা, নদীগুলোতে নিরাপদ নৌপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিতের বিষয়টি এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সারাদেশে নদী খাল জলাশয় উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গত বছর থেকে ঢাকার চারপাশে নদীর দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়। দ্বিতীয় ধাপে ফেব্রুয়ারি থেকে আবারো ওই অভিযান শুরু হয়েছে। গত বছর তিন দফায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী তীরে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এবার নদী উচ্ছেদের পাশাপাশি ঢাকার খালগুলো উদ্ধারে একযোগে অভিযান শুরুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, গত বছর রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ অন্য নদী দখল ও দূষণমুক্ত এবং নাব্য ফিরিয়ে আনতে ১০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। আর খসড়া চূড়ান্ত করার পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন পর্যন্ত নদী সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার কারণে অনেক দূষণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সকল নদী উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নদীগুলো নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণরোধ ও নাব্য বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সরকার। তাছাড়া নদী দূষণমুক্ত করে যাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম, ওয়েস্টেজ ম্যানেজমেন্টের জন্য কাজ করা হয় সেজন্য মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে পানি দূষণমুক্ত করা এবং গৃহস্থালির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে। আরবান এলাকায় যে সব বর্জ্য আছে সেগুলো শতভাগ যেন ডিসপোজ করা যায় তার উদ্যোগ নেয়া হবে। এসব পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে পারলে নদীর পাশাপাশি পরিবেশেরও উন্নয়ন হবে।

এদিকে মাস্টারপ্ল্যানে যেসব ড্রেনেজ বর্জ্য রয়েছে সেগুলো ক্রাশ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নদীর পাড়ের যেসব জায়গা দখল এবং বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে ও নদীদূষণ হচ্ছে সেগুলো দখলমুক্ত করে দৃষ্টিনন্দন ও সবুজায়ন করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা নদীর নাব্য বৃদ্ধি ও দূষণমুক্ত করার জন্য ১০ বছরের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে এক বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর ও ১০ বছরের পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- সরকারের নদী উদ্ধারের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নদীগুলোর নাব্য অনেকাংশে ফিরে আসবে। সরকারের নেয়া নদী উদ্ধারে মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত বছরের পর এ বছরও শুরু হয়েছে নদী ও খাল উচ্ছেদের অভিযান। গত কয়েক দিন ধরেই বিআইডবিস্নউটিএ গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় তুরাগ তীরে অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি স্যুয়ারেজ লাইনের মুখে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ঢাকার চারপাশে নদীর দূষণ রোধেও কাজ শুরু করা হবে। আর একবার উচ্ছেদ ও ময়লা আবর্জনা অপসারণের পর কেউ নতুন করে নদীতে ময়লা ফেললে তার জেল-জরিমানা হবে।

অন্যদিকে নদী রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি ঢাকাসহ সারাদেশে খাল উদ্ধারে শুরু হচ্ছে একযোগে অভিযান। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঢাকার খাল উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে। রাজধানীর রামচন্দ্রপুর খাল এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অবৈধ দখলদারদের কারণে রামচন্দ্রপুর খাল রীতিমতো ভরাট হয়ে গেছে। খাল দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়েছে। উচ্চ আদালত থেকে আগেই নির্দেশনা রয়েছে সিএস খতিয়ান ধরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তবে অভিযান চালাতে গিয়ে যেখানে হতদরিদ্র মানুষ থাকে, নদীর বাঁধ ভাঙা মানুষ থাকে তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে তারপর উচ্ছেদ করা। স্কুল-কলেজ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির থাকলে সেগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। নদী-খাল উদ্ধারে সরকারের ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যানের অংশ হিসেবে এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ছোট ছোট পার্ক নির্মাণ, বৃক্ষরোপণসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেছেন, সারাদেশে দখল হয়ে যাওয়া নদীখালের পরিমাণ নির্ণয় করেই এই অভিযান পরিচালনা করা হবে। দেশের ৬৪ জেলার ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনর্দখল প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সারাদেশে একযোগে নদী-খাল-বিলের দখলকৃত জায়গা উদ্ধারে একযোগে অভিযান শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী-খাল দখলমুক্ত করতে বারবার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা প্রত্যেকটি আরএস, সিএস ধরে ধরে প্রত্যেক জেলায় কোথায় কোথায় নদী-খাল দখল করা আছে সেটি নিরূপণ করেছি। পানি আইন ২০১৩ অনুযায়ী যেসব নদী-নালা, খাল-বিল বেদখল হয়ে গেছে সেগুলো উদ্ধার এবং খনন কাজ হাতে নিয়েছি।

Development by: webnewsdesign.com