এবার কি চায় পাকিস্তান!

বৃহস্পতিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১:৪১ অপরাহ্ণ

এবার কি চায় পাকিস্তান!

ভারত অধ্যুষিত জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ অঞ্চলের বিশেষ অধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক বিধি ৩৭০ প্রত্যাহারের ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে পাক-ভারত বৈরীতায়। বহুলালোচিত এই ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও সৃষ্টি হয়েছে নানা বিভাজন ও মতভেদ। কেউ বলছেন বিষয়টি ভারতের একান্ত নিজেস্ব ব্যাপার। আবার কারো কারো মতে কাশ্মীরি জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা উচিত আন্তর্জাতিক মহলের। তবে এ নিয়ে সংঘাতপূর্ণ কোনো পরিস্থিতি সৃষ্ট্র মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি নষ্ট হোক তা কেউ-ই চান না।

বিষয়টি নিয়ে খোদ ভারতীয়দের মাঝেও রয়েছে মতবৈষম্য। তবে সর্বোপরী তাদের দাবি, এই বিষয়টির সমাধানে তারা বহিরাগত কোন পক্ষের হস্তক্ষেপ একেবারেই চায় না। তারা চান, দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ আর নানা কারণে অবহেলিত এই অঞ্চলটির ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্তই নেইয়া হোক তা যেন এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্যে হয়।

জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার প্রত্যাহারের ইস্যুতে এ যাবত সবচেয়ে কট্টর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। এ প্রসঙ্গে ভারতের বিরোধীতা করছে তারা। পাকিস্তানের দাবি, জম্মু-কাশ্মীর অঞ্চলটি মুসলিম প্রধান হওয়ায় সেখানকার মানুষের অধিকার হরণের লক্ষ্যেই এমনটি করেছে ভারত সরকার। সেখানে চলমা সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের বিরুদ্ধে মূলত পাকিস্তানের এই বিরোধীতা। তবে তাদের এই বিরোধীতা প্রকাশের পন্থাটি লক্ষ্য করলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, পাকিস্তানের এই যে ‘সাম্প্রদায়িকতার ইস্যু’ তত্ত্বটি, সেটি আসলে একটি প্রহসনমূলক ইস্যু। ভারতের বিরুদ্ধে বিরোধীতা প্রকাশের ক্ষেত্রে যে অসংযত, সহিংস, আক্রমনাত্মক ও আগ্রাসি মনোভাব দেখাচ্ছে পাকিস্তান তা কোনোভাবেই নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর স্বপক্ষ শক্তির মনোভাবা হতে পারে না। আর সেটি বোঝার জন্য বিশদ জ্ঞান থাকার প্রয়োজন নেই।
সিসি টিভি ফুটেজে তাজ হোটেলে হামলাকারী দুই পাক-জঙ্গি- এপি

অন্যদিকে ভারতের প্রেক্ষাপট বিবেচনা বলা যায়, পুলাওয়ামা হামলার পর জম্মু-কাশ্মীরের শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের এই পদক্ষেপটি যে কারণে নেয়া হয়েছে তা যথেষ্ট যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক। তবে উভয় পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি মন্তব্যের মাঝে মূল যে প্রসঙ্গটি সেটিই যেন রয়ে যাচ্ছে আলোচনার বাইরে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যে দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেয়া সবচেয়ে জরুরি তার একটি হচ্ছে কেন এই অঞ্চলে শাসন ব্যবস্থার এমন সংস্কারে বাধ্য হল ভারত ও এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানে বিরোধীতার মূল কারণটি কি এবং তা কতটা যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য।

জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলে যে বিশেষ আঞ্চলিক অধিকারের বিধান কার্যকর ছিল তা অনুসারে এ অঞ্চলের স্থানীয় সরকারের অন্যতম একটি ক্ষমতা ছিল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়াই রাজ্য সরকার যে কাউকে বৈধ নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষমতা রাখতেন। যা বিধান বিলুপ্তির ফলে আর থাকছে না। মূলত আইনের এই ফসকা গেরো গলেই সেই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ভারতের মাটিতে ক্রমেই জঙ্গিদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠতে শুরু করে। আর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে ভারতের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার অপচেষ্টা চালায় পাকিস্তান। বিভিন্ন জংগি সংগঠনগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের সরোকার ও সেদেশের সেনাবাহিনীর সম্পর্কের কথা সারা বিশ্বেরই জানা।

মূলত এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতি উত্তরণের জন্যেই সে অঞ্চলের আঞ্চলিক বিশেষ অধিকার রোধ করে জম্মু ও কাশ্মীরসহ পুরো উপত্যকা অঞ্চলকে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার।
ভারতসহ সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে বার বার পারমানবিক যুদ্ধের হুমকি দেয়া পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও সেদেশের প্রধান সেনা মুখোপাত্র

বিশেষ করে ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরে পাকিস্তানে অধিষ্ঠিত জঙ্গি সংগঠন জঈশ-ই-মুহম্মদ পরিচালিত এক আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় অর্ধশতাধিক ভারতীয় জওয়ান নিহতের ঘটনার জেরে এই প্রক্রিয়া জোরদারভাবে শুরু হয়। ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে পাকিস্তানী জঙ্গিদের দীর্ঘ দিনের এই নিরাপদ আশ্রয়টি নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন মহলের ধারণা, কাশ্মীরের অভয়ারণ্য রক্ষার তাগিদে প্রভাবশালী এই জঙ্গি সংগঠনটি ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চাপ দিতে থাকে ইমরান খান নিয়াজী সরকারকে।

তবে তাদের এই ধারণা যে একেবারে অমূলক নয় তা প্রমাণিত হয় যখন জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের বিশেষ অধিকার রোধের পর অঞ্চলটি জঙ্গিমুক্ত করার লক্ষ্যে অভিযানে নামে ভারতীয় সেনাবাহিনী। এ সময় প্রকাশ্যেই একাধিকবার ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়ায় পাক সেনারা। জঙ্গিবাদের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন না থাকলে এমন স্পর্শকাতর মুহূর্তে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সীমান্তে সংঘাতে জড়ানোর আর কোনো যৌক্তিকতাই চোখে পড়ে না।

শুধু তাই নয়, ভারতে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে সীমান্তে জঙ্গি ক্রসপাসিংয়ের সময়ও নিজেদের সীমান্ত থেকে ব্যাক আপ ফায়ারিংয়ের মাধ্যমে ভারতীয় সেনাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা চালায় পাক সেনারা।
পাক-অধিষ্ঠিত উগ্রবাদী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে থাকা আলোচিত কয়েকজন জঙ্গি নেতা

পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সেই দেশের মাটিতে লালিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর আগ্রাসনে শুধু ভারত নয় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মত দক্ষিন এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোরও বহু ভোগান্তির নজির রয়েছে। এ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দমনের যে কার্যক্রম ভারত সরকার গ্রহণ করেছে তা শুধু ভারত নয় বরং গোটা দক্ষিন এশীয় অঞ্চলের স্বার্থ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর সেটি বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে এক রকম বাস্তুহারা হয়ে পড়বে জঙ্গিরা।

এরইমধ্যে জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির প্রয়োগে যে ব্যাপক সফলতা অর্জিত হয়েছে তা তাতে সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব অনেকাংশেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে ভারত সরকারের এই কার্যক্রম সফল হলে পাকিস্তানের জন্য তা হবে ভয়াবহ।

ভারত ও বাংলাদেশের বুকে সহিংসতার মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে জঙ্গি নামের যে উগ্র মানসিকতার হিংস্র মানবগোষ্ঠিটি লালন করে আসছে পাকিস্তান, তারা সবাই তখন তাদের একমাত্র আশ্রয় হিসেবে ঠাঁই নেবে পাকিস্তানী ভূখণ্ডে। এক পর্যায়ে এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে আর তাদের দমনে অস্ত্র হাতে ব্যারাক ছেড়ে বেরিয়ে আসবে পাক সেনাবাহিনী যা নিঃসন্দেহে পুরো পাকিস্তানজুড়ে গৃহযুদ্ধের আবহ সৃষ্টি করবে। সংঘাত আর সহিংসতার জেরে যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে গোটা দেশে তা ক্রমাগত ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে তাদের। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে যদি বেলুচদের মত পাক-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘ শোষণের প্রতিশোধ নিতে যদি মুখিয়ে ওঠে সেক্ষেত্রে যে পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার নুন্যতম সম্ভাবনাটুকুও আর থাকবে না তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে জম্মু-কাশ্মীরের শাসন ব্যবস্থা সংস্কারে ভারত সরকারের নেয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে এরইমধ্যে নিজেদের ভাবি সংকটের অশনি সংকেত পেয়ে গেছে পাক সরকার। আর তাই ভারতের এই সিদ্ধান্ত রুখতে তারা এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠেছে যে সামান্য হিতাহিত জ্ঞানটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে। নইলে একটি রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ভূখণ্ডের শাসন ব্যবস্থা সংস্কারে কি পদক্ষেপ নেবে তা যদি অপর একটি রাষ্ট্রের স্বার্থহানী না ঘটায়, তবে কেন তারা সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার মত আগ্রাসি মানসিকতা দেখাবে? ভারত তো পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য বা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে নয়। কিংবা কাশ্মীরের জনগণ তো নালিশ করেনি পাকিস্তানের কাছে। যদি সেটাও করে থাকে, তবুও পাকিস্তানের অধিকার নেই এমন দৃষ্টিকটূ আচরণ প্রদর্শনের। ভারত ধৈর্য্য ধারণ না করলে পাকিস্তানের এই আগ্রাসি মানসিকতা গোটা দক্ষিন এশীয় অঞ্চলের জন্য প্রলয়ঙ্করী হতে পারতো। ধরে নিলাম ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের জাতিগত বিরোধীতা রয়েছে বলে তারা ভারতের প্রতি এমন উগ্রতা প্রদর্শন করছে। তাহলে সারাবিশ্বকে পারমানবিক যুদ্ধের হুমকি দেয়ার যে ধৃষ্টতা পাকিস্তান দেখালো, এর যৌক্তিকতা কি? ভারত সরকার যদি কাশ্মীরিদের অধিকার হরণ করে মানবাধিকার নীতিমালা লঙ্ঘণের দায়ে দোষী বলে বিবেচিত হয়, তাহলে পরমানু যুদ্ধের হুমকিতে সারা বিশ্বমানবতার বিরুদ্ধে মানবাধিকার নীতিমালা লঙ্ঘণের দায়ে পাকিস্তান কেন দোষী সাব্যস্ত হবে না?

পাকিস্তান যতই বলুক যে কাশ্মীর অঞ্চলের মুসলমানদের স্বার্থে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তারা পারমানবিক যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এমন স্পর্শ কাতর ইস্যুগুলো সমাধানে শান্তিপূর্ণ পদক্ষেপ না নিয়ে আগ্রাসনের হুমকি অমূলক। তাছাড়া এমনতর সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালত কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে তা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমেই প্রমাণিত। তাহলে এই অতি সচেতন পাকিস্তান কেন আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে পরমানু যুদ্ধের হুমকি দিল, যা কিনা গোটা মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেতার হুমকি স্বরূপ! যারা অনধিকার চর্চার বৈধতা অর্জনের লক্ষ্যে ভারতের মত একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে গিয়ে বিশ্বমানবতার স্বার্থের কথাই বেমালুম ভুলে গেছে তারা কিনা চিরশত্রুর ভূখণ্ডে লালিত একটি অঞ্চলের মানুষের স্বার্থে নিবেদিত হতে মরিয়া! এ কথা কোনোভাবেই কি বিশ্বাসযোগ্য বলে মেনে নেয়া সম্ভব?

তাহলে কাদের বিরুদ্ধে আসলে বৈশ্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত, কাদের মানবতাবিরোধী আচরণ ও স্বাধীন কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব-বিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় ওঠানো উচিত- সেই প্রশ্ন না হয় সচেতন বিশ্ব বিবেকের বিবেচনাধীন রইলো। আজ কোন পাকিস্তানি শাসকদের মুখে মানবতার বুলি ঝড়ছে সেটাই হচ্ছে লক্ষণীয় ব্যাপার। মানবতাবিরোধী আগ্রাসন সৃষ্টিতে আর নিরীহ মানুষ হত্যার বিকৃত উদযাপনে পাক-শাসকগোষ্ঠীর ঈর্ষনীয় সাফল্যের কথা নতুন করে নাই বা বললাম। তবে পৃথিবী ভুলে গেলেও কসাই টিক্কা, ইয়াহিয়া, নিয়াজী আর ভুট্টোদের পৈশাচিকতার কথা নিশ্চয় ইতিহাস কোনোদিন ভুলে যাবে না। তাদের সুযোগ্য উত্তরসূরীদের কাছ থেকে প্রহসন ছাড়া আর কি-ই বা প্রত্যাশিত।

Development by: webnewsdesign.com