আবহাওয়ার বৈরী আচরণেও ঘরে বসে নেই কৃষকরা

বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২০ | ৩:২৯ অপরাহ্ণ

আবহাওয়ার বৈরী আচরণেও ঘরে বসে নেই কৃষকরা

সারাদেশে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বোরো ধান রোপণের শুরুতে প্রকৃতির এমন বৈরী আচরণেও ঘরে বসে নেই কৃষক। কোমর বেঁধে বোরো আবাদে মাঠে নেমেছেন তারা। বোরো মৌসুমে কৃষকদের দম ফেলার ফুরসত নেই। কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন ফসলের হাসি দেখতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, এবার সারাদশে ৪৮ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে রোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর দুই লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে রোরো ধানের বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দুই লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি হয়। বীজতলার পর্যাপ্ততায় সারা দেশে বুধবার প্রায় ৩৫ ভাগ বোরো জমিতে ধানের চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। আর হাওরাঞ্চলে সম্পন্ন হয়েছে ৯৫ ভাগ।

চালের পর্যাপ্ত আমদানি ও আমনের বাম্পার ফলনেও কমেনি চালের বাজারের অস্থিরতা। অবস্থা বিবেচনায় সরকার বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে। বোরো মৌসুমে সার ও ডিজেল সংকট যেন না হয় সেজন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পাশাপাশি সার ও ডিজেলের পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। চোরাচালান ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে সীমান্তে। সেচ কাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গ্রামে বেশি বিদ্যুৎ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। দেশে বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ব্যবহার বাড়লেও এখনো বিপুলসংখ্যক কৃষক ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করেন। বিদ্যুৎ পাম্পে ২০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। মাঠ কৃষকের পাশে নেমেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শতাধিক টিম। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সারা দেশে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সব পরিচালকের নেতৃত্বে মনিটরিং টিম গঠন করে মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বোরো মৌসুম অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের জন্য ১৪ লাখ ৭৫ হাজার টন ডিজেল মজুদ করেছে সরকার। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলে ডিজেল দেওয়া হয়েছে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার টন। উত্তরাঞ্চলসহ পুরো দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ করতে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি শুরু করেছেন। বিআইডব্লিউটিএ জ্বালানি তেল সরবরাহের বিভিন্ন নৌরুটের অবস্থা সার্বক্ষণিক মনিটর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। জ্বালানি তেল ডিপোগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও কোস্টগার্ড নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের হিসাবে দেশে বছরে ২৬ লাখ টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে প্রয়োজন হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন। এবার বোরো উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১৪ লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুদ করেছে। ডিজেল ও সার পাচাররোধে বিজিবিসহ সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে বিশেষ টাস্কফোর্স।

বোরো আবাদে প্রতিদিনই ডিজেলের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে কদিন ধরে ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান সামছুর রহমান বলেন, ডিজেলের কোনো সংকট নেই, বরং ১৩ দিন সরবরাহ করা যাবে এমন পরিমাণ ডিজেল আছে। ডিজেল নিয়ে একাধিক জাহাজ সমুদ্রে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পুরো বোরো মৌসুমে আমাদের হাতে থাকবে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টন ডিজেল। মৌসুম শেষে অতিরিক্ত ডিজেল কীভাবে বিক্রি করব তা নিয়ে চিন্তায় আছি।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের হিসেবে বছরে সারাদেশে ২৫ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বোরো মৌসুমের জন্য প্রয়োজন হয় ১৬ লাখ টন।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জিএম (মার্কেটিং) মঞ্জুর রেজা বলেন, গতকাল পর্যন্ত মজুদ রয়েছে ১২ লাখ টন। আগামী আড়াই মাসে আরও লাগবে ১০ লাখ টন। এর মধ্যে দেশের সার কারখানাগুলো উৎপাদন করবে আরও চার লাখ টন। এ হিসেবে মৌসুম শেষে মজুদ থাকবে প্রায় ছয় লাখ টন সার।

সারাদেশে মোট সেচ পাম্পের মধ্যে ৮০ ভাগ চলে বিদ্যুতে। আর ২০ ভাগ চলে ডিজেলে। দেশের নতুন নতুন এলাকা বিদ্যতায়িত হওয়ায় সেচে সংযোগ নেওয়ার হার বেড়েছে। বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ রয়েছে রাজশাহী এবং রংপুর অঞ্চলে। এরপর বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় রয়েছে ২১ ভাগ, বৃহত্তর খুলনায় রয়েছে ১৪ ভাগ। বাকি ১৬ ভাগ পাম্প রয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তবে এর সঙ্গে বর্তমানে যোগ হয়েছে সৌর বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের পরিচালক আহমেদ হোসেন বলেন, চলতি বোরো মৌসুমের জন্য তিন লাখ ৬৫ হাজার সেচ পাম্প বিদ্যুতে চালানো হচ্ছে। আরইবি এককভাবে তিন লাখ ২০ হাজার সেচ পাম্পের সংযোগ দিয়েছে। অন্য বিতরণকারীরা আরও ৪৫ হাজার সেচ সংযোগ দিয়েছে। বোরো উৎপাদনে কোনো সংকট হবে না বলে তিনি দাবি করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক চন্ডীদাস কুন্ডু বলেন, তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে সারা দেশে কিছু বোরোর বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার পরিমাণ মাত্র ৭ শতাংশ। অথচ এবার বোরোর বীজতলা অতিরিক্ত হয়েছে ১৫ শতাংশ। ফলে বীজের কোনো সংকট নেই। কৃষি সম্প্রসারণের সব পরিচালক মাঠে নেমেছেন। বোরো উৎপাদন বিষয়ে যে কোনো সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, গতকাল বুধবার পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৩৫ শতাংশ বোরো জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। আর সিলেটের হাওর এলাকায় এ পরিমাণ প্রায় ৯৫ শতাংশ। তিনি নিজেও হাওর অঞ্চলে অবস্থান করছেন উল্লেখ করে বলেন, কোন ব্যবসায়ী সার ও ডিজেল মজুদ করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।

Development by: webnewsdesign.com